মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ন
দায়িত্ব নেওয়ার আড়াই মাসের মাথায় অন্তর্বর্তী সরকারকে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি। প্রতি সপ্তাহেই পণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়লেও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাজারে এক সপ্তাহে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম বেড়েছে—চাল, ভোজ্যতেল, চিনি ও পেঁয়াজ। আগেই এই পণ্যের দাম ছিল বেশ চড়া। অনেক আলোচনার পর ডিমের দাম কিছুটা কমলেও পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসেনি। শুল্ক বাড়ালে পণ্যের দাম দ্রুতই বেড়ে যায়। কিন্তু চিনি ও চালের শুল্ক–কর কমানো হলেও বাজারে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি। বরং ভোক্তাদের আগের তুলনায় বেশি দাম দিয়ে এসব পণ্য কিনতে হচ্ছে। গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য চাল, ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বড় ধাক্কা। গরিব মানুষের প্রধান খাদ্যই ভাত। ফলে চালের দাম বাড়লে অনেকেই কম পরিমাণে কিংবা নিম্নমানের খাবার কিনতে বাধ্য হন। সবজির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কথা বলা হলেও সরকার বন্যাদুর্গত এলাকায় কৃষি পুনর্বাসনের জন্য যথাযথ উদ্যোগ নেয়নি। এ অবস্থায় পরবর্তী মৌসুমে সবজির দাম কমবে বলে আশা করা যায় না। গণমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বগুড়ার মতো সবজির ভান্ডারে পর্যন্ত প্রায় সব সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। দুর্যোগকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী ও আড়তদারেরা অবৈধভাবে মুনাফা অর্জন করছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিন্ডিকেট পণ্যের দাম বাড়ানোর অভিযোগ ছিল। সেই সরকারে নীতিনির্ধারক ও অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে আঁতাত ছিল, যা পুরোপুরি মিথ্যা নয়। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের পরও এই সিন্ডিকেট ভাঙার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাজার ব্যবস্থাপনা একই রকমভাবে চলছে। অর্থনীতিবিদেরা নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে যে কারণগুলো চিহ্নিত করেছেন, সরকার সেগুলো যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে বলে মনে হয় না। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সবার আগে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাজার তদারকির ক্ষেত্রেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার, যাতে ব্যবসায়ীরা কারসাজি করতে না পারেন।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিচ্ছিন্ন ও অসংলগ্ন পদক্ষেপ কোনো কাজে আসেনি। যেখানে দেশের দৈনিক ডিমের চাহিদা ৪ কোটি, সেখানে সমপরিমাণ ডিম আমদানি করে কীভাবে দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে? অনেকেই বলেছেন, আমদানি পণ্যের সিন্ডিকেট ভেঙে দিলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ বেশির ভাগ খাদ্যপণ্য কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আমদানি করে থাকে। এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং মূল্য কমতে পারে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনও অত্যন্ত জরুরি বলে আমরা মনে করি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিবহনে চাঁদাবাজি কমলেও আড়তদার ও মিলমালিকদের কারসাজি বন্ধ হয়নি। আশা করা যায়, সরকার এ বিষয়েও দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। মুক্তবাজার অর্থনীতি মানে যা ইচ্ছা তা করা নয়। ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানের মতো আমরাও মনে করি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সংস্কার কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।